ধূল্যা ভূবন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাস
তৎকালীন ঢাকা জিলার মানিকগঞ্জ মহুকুমার সাটুরিয়া থানা ও ইউনিয়নে ধূল্যা গ্রামে অবস্থিত। তদানীন্তনকালে (বৃটিশ আমলে) গ্রামটি হিন্দু প্রধান ছিল। এ গ্রামেই বসাবাস করতেন জমিদার ভূবন মোহন রায় ও তদীয় বংশধর। ভূবন মোহন রায় মহাশয়ের অপরূপা সুন্দরী একমাত্র কন্যা সন্তান ছিলেন যার নাম হেমন্ত কুমারী রায়। রাজশাহীর নাটরের পুটিয়ার জমিদার পুত্র হেমন্ত কুমারীর রূপে মুগ্ধ হয়ে মাত্র ১২ বছরের কন্যাকে বিবাহ বন্ধনে আবব্ধ করেন। হেমন্ত কুমারীর বয়স যখন ১৪ বছর তখন তার স্বামীর অকাল মৃত্যুবরণ করেন। তখন ঐ জমিদারী পরিচালনা করার মত কন দক্ষ ব্যাক্তি না থাকায় হেমন্তকুমারীর উপর পুটিয়ার জমিদারী স্টেট পরিচালনা দায়িত্ব অর্পিত হয়। অল্প বয়সে ও অল্প কিছু দিনের মধ্যে জমিদারী টেস্ট পরিচালনায় খুব দক্ষতার পরিচয় দেন। তার ফলশ্রুতিতে তিনি “রানী” উপধী লাভ করেন এবং রানী হেমন্ত কুমারী নামে পরিচিত হন।
হেমন্ত কুমারী তার পৈত্রিক জমিদারী ও পিতামাতাকে দেখা শোনার জন্য প্রায়শই ধূল্যা গ্রামে আসতেন এবং দরিদ্র লোকজনদের যথেস্ট সাহায্য সহায়তা করতেন। অত্র এলাকায় শিক্ষা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে, দু’একজন যারা লেখাপড়া করতেন তাদের অনেক দূর দুরান্তে গিয়ে লেখাপড়া করতে হতো। রানী হেমন্ত কুমারী যখনই ধূল্যা গ্রামে আসতেন তখনই ভাবতেন এ গ্রামের ঘরে ঘরে কিভাবে শিক্ষার আলো পৌঁছানো যায়। ইতিমধ্য রানী হেমন্ত কুমারীর পিতা ভূবন মোহন রায় মহাশয় পরলোক গমন করেন। তার পরলোকগত পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে এবং অত্র এলাকার অশিক্ষিত ও দরিদ্র গ্রাম বাসীর সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য তিনি তার পিতা ভূবন মোহন রায় মহাশয়ের নামে একটি বিদ্যালয় নির্মানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন
অতঃপর ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে জমিদারের নিজ ভূখন্ডে ধূল্যা ভূবন উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় ( Dhulla B.M ,.H.E School) প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তারিখ ০৫/০১/১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ। প্রথম অবস্থায় তৃতীয় শ্রেণি হতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শূরু হয় এবং কলিকাতার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্বীকৃতি পায়। অল্প কিছুদিনে ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় পঞ্চম শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বিদ্যালয়টি ঢাকা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধিনে চলে আসে এবং স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৬০ সন হতে ষষ্ঠ শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শুরু হয় এবং উহা অদ্যবদি সুনামের সাথে দিকে দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য ইতি মধ্যেই ধূল্যা ভূবন মোহন উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়টির নাম ইংরেজী বাদ দিয়ে ধূল্যা ভূবন মোহন উচ্চ বিদ্যালয় নামকরণ করা হয় এবং ধূল্যা বি.এম.উচ্চ বিদ্যালয় নামে স্বীকৃত ও প্রচলিত।
বিদ্যালয়টি জন্মলগ্নে প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্রীযুক্ত বাবু দিনেশ চন্দ্র লাহেরী। কালের বিবর্তনে পরবর্তীতে অনেক বিজ্ঞ ব্যাক্তিবর্গ এখানে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতেই বিদ্যালয়টির সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু দূর-দূরান্ত হতে অনেক শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করার সুযোগ পেয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা, ক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়টি সুনামের সাথে অগ্রসর হতে থাকে। আনুমানিক ১৯৪৮ সালে কিছু কুচক্রিমহলের চক্রান্তে ও কতিপয় ছাত্র নির্বাচনী পরিক্ষায় অকৃকার্য ছাত্রদের সহায়তায় পেট্রোল / কেরোসিন দিয়ে সম্পুর্ন বিদ্যালয়টি পুড়িয়ে ভস্মীভূত করা হয় । বিদ্যালয়ের সমস্ত অবকাঠামো, আসবাবপত্র, লাইব্রারীর সমস্ত বই পত্র ও যাবতীয় মূল্যবান কাগজপত্র আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অত্র এলাকার ছাত্র সহ অভিভাবকবৃন্দ এবং জনসাধারণ খুবই হতাসাগ্রস্ত ও ভেঙ্গে পড়েন। এত ক্ষতি হওয়ার পড়ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বিদ্যালয়টির অগ্রযাত্রার পথ থেমে থাকেনি।
অত্র এলাকার শিক্ষানুরাগী জনসাধারণ ও পার্শবর্তী ধামরাই থানার গাঙ্গুটিয়ার জমিদারের সহায়তায় পুড়ে যাওয়া টিন দিয়ে বিদ্যালয় গৃহ ও নতুন করে আসবাবপত্র নির্মাণ করে বিদ্যালয়টির অগ্রযাত্রা অব্যাহিত থাকে। তদানীন্তন কালে সাটুরিয়া থানা সদরে কোন উচ্চ বিদ্যালয় ছিল না। তাই তদানীন্তন সাটুরিয়ার নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিদের কু নজর পড়ে ধূল্যা ভূবন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের উপর। স্থানীয় স্বল্প সংখ্যক কূচক্রি মহলের সহায়তায় সাটুরিয়ার প্রভাবশালী কুচক্রি মহল ঐতিয্য বাহী ধূল্যা ভূবন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়টিকে স্থানান্তরিত করে সাটুরিয়ায় স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। উক্ত খারাপ পরিকল্পনাটি ধূল্যা গ্রামবাসী সহ আশেপাশের গ্রামবাসী অবহিত হওয়ার পর তারা সংঘবদ্ধ প্রতিজ্ঞ্যা করেন, “রক্ত দিব তবুও স্কুল দিব না”জাতী ধর্ম নির্বিশেষে অত্র এলাকার আবাল বৃদ্ধবনিতা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যাক্ত করেন যে, যে কোন প্রকারের সাটুরিয়ার কুচক্রিমহলের পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিতে হবে।
১৯৫৮ সালের কোন একদিন বর্ষাকালে সাটুরিয়ার তদানীন্তন কতিপয় নেতৃবৃন্দ স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় লাঠিয়াল বাহিনীসহ নৌকা যোগে জোড়পুর্বক বিদ্যালয় ভবন ভেঙ্গে সাটুরিয়া নিয়ে যাওয়ার জন্য আসে। মুহুর্তের মধ্যে খবরটি ছড়িয়ে পরার সাথে সাথে স্থানীয় ও আশেপাশের সর্বস্তরের জনসাধারণ সাটুরিয়ার বাহিনীকে বাঁধা দেয় এবং তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ফলশ্রুতিতে কিছুক্ষণের মধ্য দাঙ্গা হ্যাঙ্গামা শুরু হয়। অপ্রস্তুত ধূল্যা গ্রামবাসী প্রানের স্কুল রক্ষার্থে জীবন বাজী রেখে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রচন্ড তোপের মুখে সাটুরিয়ার বাহিনী আত্মরক্ষায় পিছু হটে পলায়ন করতে যেয়ে একজনের জীবনও হারায় বলে কথিত আছে।
স্কুল রক্ষার্থে অত্র এলাকার জনগণকে গন আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। তখন পুর্বপাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রি ছিলেন ধামরাই থানার বালিয়া গ্রামের কৃতি সন্তান মরহম জনাব আতাউর রহমান খান। মামলা মোকদ্দমার পরও অত্র এলাকার জনসাধারণের দাবীর প্রেক্ষিতে অত্র গ্রামের ইতিহাসের ধারক ও বাহক ঐতিয্যবাহী বিদ্যালয়টি যথাস্থানে অর্থাৎ ধূল্যা গ্রামের যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে বলে জরুরী নির্দেশ দেন। ঐ সময় হতে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত স্কুলের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাব্যবস্থা সহ শিক্ষার মান ঝিমিয়ে পড়ে। ১৯৬৬ সালে বিদ্যালয়ের দূর্দিনে মরহুম তাজউদ্দীন সাহেব প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ের হাল ধরেন। তারপর হতে আবারও বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি সহ লেখাপড়ার মান উন্নতি লাভ করতে থাকলে বিদ্যালয়টি তার হারানো গৌরভ ফিরে পেতে থাকে। ইতিমধ্যে সরকারী সহায়তায় একটি একতালা পাকা ভবন নির্মিত হয়।
তার কিছুদিন পড় বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ও শিক্ষার মান বিবেচনা করে ছাত্রদের পড়ার জন্য বিদ্যালয় কৃর্তপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে তিনটি শাখা যথা ১) বিজ্ঞান ২) বাণিজ্য ৩) মানবিক শাখার খোলার অনুমতি বোর্ড কর্তৃক পাওয়া যায়। ফলশ্রুতিতে সরকারী অনুদানে একটি বিজ্ঞান ভবন নির্মিত হয়। অত্র এলাকার প্রাক্তন চেয়ার্ম্যান মরহম মোহাম্মদ আলী সাহেবের স্ত্রী বিদ্যালয় সংলগ্ন একটি পুকু্র দান করেন। বিদ্যালয়ের পশ্চিম দিকে নিজস্ব জায়গায় এবং বিদ্যালয় কর্তৃক ক্রয়কৃত জায়গায় সরকারী সহায়তায় একটি বড় পুকুর খনন করা হয়। উল্লেখিত পুকুর দুটিতে মৎস্য চাষ করে বিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক অবস্থা কিছুটা মজবুত হয়। ফলশ্রুতিতে বিদ্যালয়ের সম্মুখভাগে কিছু পরিমাণ আবাদী জমি ক্রয় করা সম্ভব হয়। মরহুম আ ফ ম তাজউদ্দীন সাহেব সর্বাধিককাল প্রায় তেতাল্লিশ বছর অত্র বিদ্যালয়ে সুনামের সাথে প্রধানের শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে অত্র বিদ্যালয় হতে ২০০৭ সালে অবসর গ্রহন করেন। পরবর্তিকালে (অত্র বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র )সহকারী প্রধান শিক্ষক বাবু কার্তিক চন্দ্র সাহা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন।
করেন। বিগত ০১/১১/২০০৮ তারিখে জনাব মোহাম্মদ শাহজাহান প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন এবং তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এভাবেই বিদ্যালয়টি সার্বিক দিক থেকে আস্তে আস্তে উন্নতি লাভ করে। ঐতিয্যবাহী বিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে শতবছর পুর্ণ করে। ধূল্যা সহ অত্র এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ফলে বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে দেশের ভিতরে এবং দেশের বাহিরে পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়ন করছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ের শিক্ষা ভূমিকার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে এস,এস,সি ব্যাচ ২০০৭ সনের ছয় শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে , চার জন চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে , একজন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে এলাকায় আলোড়নের সৃস্টি করে। অত্র বিদ্যালয় এর প্রাক্তন ছাত্র বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদসহ অতিরিক্ত সচিব অবসরপ্রাপ্ত জনাব জহিরুল ইসলাম পদে চাকরি করেন ।
বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পরিসংখ্যান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডক্টর নজরুল ইসলাম এবং রাজশাহী বিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স বিভাগের অধ্যাপক ডঃ আলী হোসেন এর নাম উল্লেখযোগ্য । নারী শিক্ষা অত্র এলাকায় নারী শিক্ষা বিস্তারে বিদ্যালয়টির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ১৯৬৫ সালে চায়না রাণী শাহ নামের প্রথম ছাত্রী ও শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগের বছর ১৯৭০ সালে নিয়মিত ছাত্রী হিসেবে তিনিই প্রথম অত্র বিদ্যালয় হতে এস,এস,সি পাস করে নারী শিক্ষার মাইলফলক স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং অত্র এলাকায় নারী শিক্ষার প্রসার ঘটে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ছাত্রীদের সংখ্যা ছাত্রদের সংখ্যা থেকেও বেশি।
ক্রীড়া শিক্ষাঃ সাধারণ শিক্ষা ছাড়াও ক্রীড়া শিক্ষায় অত্র বিদ্যালয়ের ছাত্রী সুমি আক্তার জাতীয় পর্যায়ে অ্যাটলেটিক্স এ পরপর দুইবার চ্যাম্পিয়ন (২০১০,২০১১) ও একবার রানারআপ (২০০৯) এর মত শিরোপা অর্জন করে নিজের এবং বিদ্যালয়ের নাম বাংলাদেশ জাতীয় স্কুল ও ক্রীড়া সমিতির ইতিহাসে ধূল্যা ভূবিন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম সবর্ণাক্ষরে লিখে রাখতে ভূমিকা পালন করেন। বিদ্যুৎ সংযোগঃ ২০০৮ সালে বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ করা হয়। বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যাপারে আর্থিক সহায়তা করেন ধামরাই দি একমি ল্যাবরেটরিসের এম ডি জনাব মো হাসিবুর রহমান।